হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, হযরত আয়াতুল্লাহ আবদুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি শনিবার সন্ধ্যায় ৩৩তম আন্তর্জাতিক পবিত্র কুরআন প্রদর্শনীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রেরিত এক ভিডিও বার্তায় মহান আল্লাহর প্রশংসা, নবীগণ, আহলে বাইত (আ.) এবং হযরত সিদ্দিকা তাহেরা (সা.)-এর প্রতি দরূদ প্রেরণ করে উপস্থিত বিদ্বজ্জন, আলেম, চিন্তাবিদ ও বৈজ্ঞানিক অঙ্গনের বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গকে সম্বোধন করেন।
তিনি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেন, যেন ইমাম যামান (আ.জ.)-এর বেলায়েতের ছায়ায় তাঁর আবির্ভাব পর্যন্ত জ্ঞানভিত্তিক ও জ্ঞানপোষণকারী ইসলামী ব্যবস্থাকে সংরক্ষণ করেন।
এই মারজায়ে তাকলিদের বক্তব্যের একটি অংশ নিম্নরূপ:
পবিত্র কুরআন কেবল বহু আয়াতে নিজেকে বিশ্বজনীন গ্রন্থ হিসেবে ঘোষণা করেনি এবং বলেনি যে তা সমগ্র বিশ্বের জন্য বার্তাবাহক; বরং সে বার্তাকে জ্ঞানভোজ ও জ্ঞানের দাওয়াতের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছে। যদি গ্রন্থটি বিশ্বজনীন হয়—যা অবশ্যই তাই—এবং যদি তা বিশ্বের জন্য বার্তা বহন করে—যা অবশ্যই করে—তবে তার জ্ঞানভোজ ও দাওয়াতও বিশ্বজনীন হতে হবে। একমাত্র যে বিষয়টি বিশ্বজনীন এবং অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে অভিন্ন, তা হলো সংস্কৃতি। মানুষকে জানতে হবে—সে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে, তার বর্তমান অবস্থা কী, মহাজাগতিক ব্যবস্থা কী, মানুষের আত্মা কী এবং সমাজ কী।
পবিত্র কুরআনে জ্ঞানের দুটি অংশের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এক অংশ হলো প্রচলিত জ্ঞান, যেখানে বলা হয়েছে: “يُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ”—তিনি তাদের কিতাব ও হিকমত শিক্ষা দেন। এই জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত ফিকহ, উসূল, আইন প্রভৃতি। আরেক অংশ হলো কুরআনের বিশেষ জ্ঞান, যেখানে এমন এক ধারাবাহিক বিষয় রয়েছে যা অতীতে ছিল না এবং বর্তমান যুগেও নেই। মহানবী (সা.)-কে উদ্দেশ করে বলা হয়েছে—আপনার অসাধারণ মেধা থাকা সত্ত্বেও, যদি কুরআন না থাকত, তবে আপনি এসব জ্ঞানে পৌঁছাতে পারতেন না। মানবসমাজকেও বলা হয়েছে—তোমরা যতই উন্নতি করো এবং বৈজ্ঞানিক শক্তি অর্জন করো না কেন, কুরআন ছাড়া এসব তত্ত্বে পৌঁছাতে পারবে না।
এই দ্বিতীয় অংশটি পবিত্র কুরআনের বিশেষ অবদান। এটি যেমন ইসলামী উম্মাহ ও সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য, তেমনি নবী (সা.)-কেও উদ্দেশ করে বলা হয়েছে—“يُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ”-এর পাশাপাশি রয়েছে “وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ”—এবং তিনি তোমাদের তা শিক্ষা দেন, যা তোমরা জানতে না।
“يُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ” আরবি সাহিত্যে সেই ফারসি অভিব্যক্তির মতো, যেখানে বলা হয়: “এটি না থাকলে তোমরা কোনোভাবেই তা শিখতে পারতে না।”
আল্লাহ তাআলা নবী (সা.)-কে বলেন—তিনি আপনাকে এমন কিছু শিক্ষা দিয়েছেন, যা আপনার অসাধারণ বুদ্ধিমত্তা ও প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও ওহি ছাড়া শেখা সম্ভব ছিল না। এই আসমানের নিচে কুরআন ছাড়া এমন কোনো গ্রন্থ নেই, যা আপনাদেরকে এ বিষয়গুলো জানায়—আর তা হলো “মানবের চিরন্তন সত্তার জ্ঞান।”
মানুষ একটি চিরন্তন সত্তা, আর চিরন্তন সত্তার জন্য প্রয়োজন চিরন্তন সংস্কৃতি। মানুষ ধ্বংস হয়ে যায় না এবং অস্তিত্ব থেকে বিলীন হয় না। সত্য যে মানুষ কবরে যায় এবং তার দেহ পচে যায়, কিন্তু মানুষ চিরন্তনের পথে যাত্রী। দুনিয়া থেকে সে বরযখে প্রবেশ করে, বরযখ থেকে কিয়ামতে, সেখান থেকে জান্নাতে প্রবেশ করে এবং সেখানে চিরকাল অবস্থান করে। সেখানে বছর নেই, মাস নেই; সময় নেই, ভূমি নেই। মানুষ এক চিরন্তন সত্তা। আর চিরন্তন সত্তার জন্য প্রয়োজন চিরন্তন সংস্কৃতি।
আমরা আশা করি—হাওজাগুলো এমন হবে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন হবে, মানবসমাজ এমন হবে এবং তারা উভয় দিক থেকেই উপকৃত হবে—“يُعَلِّمُهُمُ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ” এবং “وَيُعَلِّمُكُمْ مَا لَمْ تَكُونُوا تَعْلَمُونَ”-এর শিক্ষা থেকে।
হাওজা / হযরত আয়াতুল্লাহ জাওয়াদি আমুলি আন্তর্জাতিক কুরআন প্রদর্শনীর উদ্বোধন উপলক্ষে প্রেরিত এক ভিডিও বার্তায় বলেন: যদি কোনো গ্রন্থ বিশ্বজনীন হয়—যা অবশ্যই তাই—এবং যদি তা সমগ্র বিশ্বের জন্য বার্তা বহন করে—যা অবশ্যই করে—তবে তার জ্ঞানভোজ (মায়েদা) ও দাওয়াতও বিশ্বজনীন হতে হবে। অতীত ও ভবিষ্যতের মধ্যে যে একমাত্র বিষয়টি সার্বজনীন ও অভিন্ন, তা হলো সংস্কৃতি।
আপনার কমেন্ট